আজ-  ,
basic-bank
পরীক্ষামূলক প্রকাশনা
basic-bank
সংবাদ শিরোনাম :

ঘুরে এলাম সবুজে ঘেরা রাজার পাহাড়

নিজস্ব প্রতিবেদক : মন চায় পাখা মেলে উড়তে, বাঁধাধরা গণ্ডি থেকে বেরিয়ে প্রাকৃতিক প্রশান্তির মাঝে নিজেকে মেলে ধরতে। সারা দিন ক্লাস, প্র্যাকটিক্যাল, অ্যাসাইনমেন্ট, পরীক্ষা নিয়েই ব্যস্ত থাকতে হয়। কিন্তু এ ব্যস্ততার মাঝেই যদি হঠাত্ করে একটা ঘোরাঘুরির ব্যবস্থা হয়ে যায়, তাহলে কার না ভালো লাগে। আর তা যদি হয় সবুজে ঢাকা মায়া ঘেরা প্রাকৃতিক কোন পরিবেশ, তাহলে তো কোন কথাই নেই!

ব্যস্ততার গন্ডি, নিয়মের বেড়াজাল আর যান্ত্রিক চাপের মধ্যে শিক্ষা সফরের আয়োজন শিক্ষাজীবনে স্বস্থির বাতাস বইয়ে দেয় মনে। র্বষার আগমনে সকল র্জীণতা কাটিয়ে প্রকৃতি ফুলে ফুলে সেজে উঠছে। সে সময়ে শেরপুর সরকারি (বিশ্ববিদ্যালয়) কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের আয়োজনে পাড়ি জমিয়েছিলাম শেরপুর জেলার শ্রীবরদী উপজেলার বাবলাকোনা রাজার পাহাড়ে।

পূববর্তী ঘোষনা অনুযায়ী গত ৮আগষ্ট সকাল ৯টার দিকে প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক শিক্ষার্থীরা হাজির হতে থাকেন কলেজ ক্যাম্পাসে। উৎসুক শিক্ষার্থীদের মধ্যে বাসের অপেক্ষা কাটিয়ে কয়েক মিনিটের মধ্যেই বাস এসে পৌঁছায় কলেজ গেটের সামনে। সবাই বাসে ওঠার প্রতিযোগীতায় অংশ নেন। বাস ছাড়তেই উল্লাস ছড়িয়ে পড়ে সবার মাঝে। জানালার বাতাসে শো শো শব্দে এগিয়ে চলছে গাড়ি শ্রীবরদী অভিমুখে। সঙ্গে আড্ডা আর হাসি-ঠাট্টার উৎসব শুরু হয়ে যায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে।

ঘন্টাখানেকের মাঝেই পৌঁছে গেলাম শেরপুর শহর থেকে মাত্র ৩৪ কিলোমিটার দূরে শ্রীবরদীর কর্ণঝোরা বাজারে। সেখান থেকে স্বল্প দূরত্বের মেঘালয় কন্যা গারো পাহাড়ের লাউচাপড়ায় পৌঁছে শিক্ষার্থীদের মন বেশিক্ষণ আটকে থাকেনি রেস্টহাউজে।

ঘড়িতে সময় তখন বেলা ১ টা। সূর্যি মামা মাথার উপর তার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে। এতো হৈচৈ এর মাঝে কখন যে ১টা বেজে গেল বুঝতেই পারিনি কেউ। দুপুরের খাবার গ্রহণের ঠিক আগ মুহূর্তে সবার চোখে যখন ক্লান্তির ঘোর, তখন প্রাণী বিদ্যা বিভাগের প্রভাষক গোলাম রাব্বানী স্যার ও প্রর্দশক রাশেদ মাহমুদ স্যার সবাইকে প্রাকৃতকি সৌর্ন্দযের লীলাভূমি রাজার পাহাড়ের অপার সৌন্দর্য ঘুরে দেখার আমন্ত্রণ জানান।

ছোট নদী ঢেউফা। এ নদীর শান্ত শীতল জলের স্রোতধারা এক টানা বয়ে চলেছে। সহজ সরল এ নদীর বুকে জেগে উঠা চরের বালু চকচক করছে। এর পাশেই বিশাল উঁচু টিলা রাজার পাহাড়। নদী আর সৌন্দর্যের অপরুপ লীলাভূমি রাজার পাহাড় যেন ঐশ্বরিক স্বপ্নপুরি। এর কূল ঘেঁষে নানা কারুকার্যে সাজানো উপজাতি এলাকা বাবেলাকোনা। এ গ্রাম যেন যোগ করেছে সৌন্দর্যের নতুন মাত্রা। ঢেউফা নদীর দু’পাশে সবুজ বৃক্ষ আচ্ছাদিত অসংখ্য উঁচু-নিচু পাহাড়। গভীর মমতা আর ভালবাসায় গড়া উপজাতিদের বর্ণিল জীবনধারা। অপূর্ব সুন্দর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মিলিত আহ্বান।

গারো পাহাড়ে যতগুলো পাহাড় রয়েছে তার মধ্যে এটির উচ্চতা সবচেয়ে বেশি। এ পাহাড়ের চূড়ায় শতাধিক হেক্টর জমির সমতল বিরান ভূমি। এখান থেকে মেঘালয় যেন আরো কাছে মনে হয়। এর চূড়া সবুজ আর নীলের সংমিশ্রণে যেন মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। যেন আকাশ ছোঁয়া বিশাল পাহাড়ের নৈসর্গিক দৃশ্য। এটি মনকে করে আবেগতাড়িত।

বর্ষাকালে ঢেউফা নদীর জোয়ারে কানায় কানায় ভরে উঠে। কিন্তু দিনের শেষে ভাটা পড়ে। শুকিয়ে যায় এ নদীর পানি। তবে খরস্রোতা এ নদীর পানির গতি কখনোই কমে না। সারা বছরই হেঁটে পার হওয়া যায়। ক’বছর ধরে এ নদীর দু’পাশে দুটি ব্রীজ নির্মিত হওয়ায় এখন আর নদীতে নামতে হয়না। এর বুক জুড়ে বিশাল বালুচর যা নির্মাণ কাজে ব্যবহারের জন্য শহরে নিয়ে যাচ্ছে। এ যেন রাজার পাহাড় থেকে বাবেলাকোনা কুল ঘেষাঁ বিকল্প সমুদ্র সৈকত।

এরপর দুপুরের আহার শেষে সহকারী অধ্যাপক সাহানা আক্তার ম্যাম ও প্রভাষক শামিমা রহমান ম্যাম শিক্ষার্থীদের নিয়ে বিভিন্ন প্রাণির আচরন ও বিভিন্ন উদ্ভিদের নমুনা সংগ্রহ করনে । এতে সহযোগীতা করনে ল্যাব সহকারি আবুল কালাম।
প্রাণি বিদ্যাবিভাগের বিভাগীয় প্রধান সহযোগি অধ্যাপক রেবেকা ইয়াসমিন ম্যাম বলেন, এখানে পাখির কিচিরমিচির গান চোখ জুড়ানো সবুজের ভূমি সবকছিু মিলিয়ে এক মনোমুগ্ধকর পরিবেশ।

শেরপুর ভিশন ওয়েল্ফেয়ার ফাউন্ডেশন এর সমন্বয়ক ও একই বিভাগের ছাত্র নাঈম ইসলাম বাবলাকোনার রাজার পাহাড়ের সম্ভাবনা নিয়ে বলেন, বৃহত্তর ময়মনসিংহ বিভাগে ২০ একর আয়তনের সমতল ভূমি আর কোথাও নেই । এ সমতল টিলায় র্পযটন করপোরেশন, জেলা প্রশাসন কিংবা বেসররকারি উদ্যোগে র্আকষনীয় র্পযটন কেন্দ্র গড়ে তোলা সম্ভব । এতে পিছিয়ে পড়া আদিবাসি জনগোষ্ঠি অধ্যুষতি এলাকার ‌উন্নয়নের পাশাপাশি অনেক লোকের র্কমসংস্থানের সৃষ্টি হবে ।

সবুজের পাহাড়ে ঘেরা এ রাজার পাহাড়ে যেতে চাইলে, দেশের যে কোনো প্রান্ত থেকে বাসে বা যে কোনো যানবাহনে আসা যায় শেরপুর শহরে। এখান থেকে মাত্র ৩৪ কিলোমিটার দূরে শ্রীবরদীর কর্ণঝোরা বাজার। বাস, টেম্পুসহ যে কোনো যানবাহনে আসা যায় মনোমুগ্ধকর নয়ানিভিরাম স্থান রাজার পাহাড়ে। পাশেই রয়েছে অবসর কেন্দ্র। রাত হলে সেখানে থাকার জন্য রয়েছে নিরাপত্তাবেষ্টিত আবাসিক ভবন। কম খরচে ,কম সময়ে এ গারো পাহাড় আপনাকে দেবে অনাবিল আনন্দ।

সবমলিয়ে শিক্ষা জীবনে পাহাড়ে কাটানো একটা দিনের স্মৃতি মনের ক্যানভাসে অম্লান হয়ে থাকব। সফর শেষে বিকালের সূর্যকে সঙ্গী করে পথচলা শুরু হয় ফেরার পথে। তবে সবাইকে যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছিলো সম্ভাবনাময় পর্যটন এলাকা রাজার পাহাড়। গাড়িতে উঠে কেউ কেউ এক-দুই কলি অবিন্যস্ত গানের সুর তোলে মনের অজান্তেই। এরপর শিক্ষক-শিক্ষার্থী কবিতা কৌতুকে ভরা আনন্দ-উল্লাসে গাড়ি এসে থামে কলেজের সামনে। ঠিক তখনই মনে পড়ে যায়, এবার ঘরে ফেরার পালা।

 

লিখা : নাঈম ইসলাম
সমন্বয়ক, শেরপুর ভিশন ওয়েল্ফেয়ার ফাউন্ডেশন
শিক্ষার্থী, প্রাণীবিদ্যা বিভাগ, শেরপুর সরকারী কলেজ।