আজ-  ,
basic-bank
পরীক্ষামূলক প্রকাশনা
basic-bank
সংবাদ শিরোনাম :

শামীম ওসমানকে খুঁচিয়ে আইভীর কী লাভ? কাজী সিরাজ

শুক্রবার ২ ডিসেম্বর কয়েকটি জাতীয় দৈনিকে জেলা পরিষদ নির্বাচনের যে খবর প্রকাশিত হয়েছে তাতে বলা হয়েছে ৬১ জেলার মধ্যে ১২টিতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হচ্ছেন। আরও খবর হচ্ছে, বাকি ৪৯ জেলায় বিদ্রোহী প্রার্থীর ছড়াছড়ি দেখা দিয়েছে। একাধিক পত্রিকায় একই খবর ছাপা হয়েছে। খবরটিকে বছর শেষের একটি রাজনৈতিক কৌতুক বলতে না চাইলেও কৌতূহলোদ্দীপক বলতে কারও দ্বিধা থাকার কথা নয়। সবারই জানার কথা যে, জেলা পরিষদের গুরুত্বপূর্ণ এ নির্বাচনটি জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হচ্ছে না। অথচ ইতিপূর্বে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা এবং ইউনিয়ন পরিষদ তথা স্থানীয় সরকার পরিষদের সব নির্বাচন হয়েছে জনগণের সরাসরি প্রত্যক্ষ ভোটে। অবশ্য ভোটের চালচিত্র কেমন ছিল সেটি ভিন্ন প্রসঙ্গ। জেলা পরিষদের নির্বাচন হচ্ছে পরোক্ষ ভোটে— পাকিস্তান আমলে আইয়ুব খানের ‘মৌলিক গণতন্ত্রের’ ধাঁচে। সরাসরি দলীয় নির্বাচন হলেও বিএনপিসহ অন্য কোনো দলই এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে না। এমনকি দলীয় মনোনয়নে সরকারের ‘গৃহপালিত বিরোধী দল’ হিসেবে নিন্দিত-সমালোচিত হু. মু. এরশাদের জাতীয় পার্টিও অংশ নিচ্ছে না। এমনটা হওয়ারই তো কথা। অন্য যে কোনো নির্বাচনে ভোটার চেনা যায়, কিন্তু কাকে ভোট দেবে আগাম জানা যায় না। জেলা পরিষদ নির্বাচনের ভোটারদের চেনাও যায়, তারা কাদের ভোট দেবেন বর্তমান ভোটারদের সম্পর্কে তা-ও জানা যায়। এ নির্বাচনে ভোটার হচ্ছেন স্থানীয় সরকার পরিষদের বিভিন্ন স্তরের ‘নির্বাচিত’ প্রতিনিধিরা। বিদায়ের দ্বারপ্রান্তে উপনীত কাজী রকিবউদ্দীনের নির্বাচন কমিশনের অধীনে কয়েকটি সিটি নির্বাচন ছাড়া অন্য সব স্থানীয় সরকার পরিষদ নির্বাচনে যে সীমাহীন কারচুপি ও প্রকাশ্যে সিল মারামারির উৎসব হয়েছে তাতে সরকারি দলের প্রার্থীর বাইরে অন্য দলের খুব কম প্রার্থীই দাঁড়িয়ে থাকতে পেরেছেন। সর্বত্র ছিল সরকার দলীয় প্রার্থীদের ‘জয় জয়কার’। মিডিয়ায় এমনই বেরিয়েছিল খবর। ভোটার প্রায় সব সরকারি দলের লোক। অন্য দলের লোক এই নির্বাচনে কেন যাবে সব জেনে-শুনে? নির্বাচন যেটা হচ্ছে তা লোক দেখানোই বলতে হবে। ভালো হতো নির্বাচন ছাড়া অন্য কোনো একটা পদ্ধতি বের করে সরকারি প্রার্থীদের জিতিয়ে আনার পাকা একটা ব্যবস্থা করে নিলে। সংসদেও আছেন বিনা ভোটের ১৫৩ এমপি, বাকিদের নির্বাচনও কেমন হয়েছে তা নিয়ে আলোচনা না করলেও চলে। সরকারের ‘দানবীয়’ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে বর্তমান সংসদে। নির্বাচন ছাড়াই জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বানানোর ‘পদ্ধতিটা’ সংসদে পেশ করলেই তো পাস! তা হলে শুধু শুধু রাষ্ট্রের তথা জনগণের বিপুল অর্থ খরচ হতো না এই অর্থহীন জেলা পরিষদ নির্বাচনে। যেহেতু নির্বাচনটি প্রত্যক্ষ ভোটের নির্বাচন নয়, যেহেতু অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বী দলকে নিয়ে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনও নয়, সেহেতু এই নির্বাচন সরকারদলীয় প্রার্থীদের নিজেদের মধ্য থেকে একজনকে চেয়ারম্যান হিসেবে বাছাই করার নির্বাচনই তো হবে। পৃথিবীর যে কয়েকটি দেশে গণতন্ত্রের মেকি আবরণে একদলীয় ব্যবস্থা চালু আছে সেখানে নির্বাচন তো হয় একই দলের একাধিক প্রার্থীর মধ্যেই। প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ‘জিতে’ যান কেউ। এখানেও তেমনই হচ্ছে। সাংবাদিক বন্ধুরা বা মিডিয়া এই নির্বাচনে ‘বিদ্রোহী প্রার্থী’ দেখলেন কোথায়? নির্বাচন যে একটা হচ্ছে দেশ-দুনিয়াকে দেখাতে হবে তো! নিশ্চিত করেই বলা চলে জেলা পরিষদ নির্বাচনে দলের মনোনীত প্রার্থীর বিরুদ্ধে যারা প্রার্থী হয়েছেন তাদের কাউকে ‘সংগঠন বিরোধী’ কার্যকলাপের দায়ে দল থেকে বহিষ্কার করা হবে না— যেমন করা হয়েছিল অন্যান্য স্থানীয় সরকার নির্বাচনে। এ নির্বাচন নিয়ে সারা দেশে কোনো আলোচনা নেই, আলোড়ন নেই। সবার দৃষ্টি এখন নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচনের দিকে। কেননা, এতে দেশের অন্যতম প্রধান বিরোধী দল বিএনপি অংশগ্রহণ করছে। সবাই জানেন ও মানেন যে, সরকারের ‘পোষমানা’ একটি বিরোধী দল জাতীয় সংসদে থাকলেও বিএনপিই সরকারের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, তারাই প্রকৃত বিরোধী দল। সংসদের ‘গৃহপালিত’ বিরোধী দল বলে কঠোরভাবে সমালোচিত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টি নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক) নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করলেও এই নির্বাচনকে সবাই অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনই বলছেন। বিএনপি ও আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছাড়াও আরও ছয়জন প্রার্থী মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ৩৭ জন সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর প্রার্থী ছাড়া আরও ১৬৬ জন প্রার্থী। বাংলাদেশের স্থানীয় কিংবা জাতীয় যে কোনো নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি অংশগ্রহণ করলেই মানুষ তা অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন বলে ভেবে নেয়; আর কেউ নির্বাচনে এলো কি এলো না তা নিয়ে অতশত ভাবে না। নাসিক নির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী না দেওয়া নিয়ে অন্য কথাও উঠেছে। বলা হচ্ছে এই নির্বাচন এবার শাসক দলের জন্য একটি পরীক্ষা। সেখানে দলের মধ্যে তীব্র কোন্দল। শামীম ওসমান আর সেলিনা হায়াৎ আইভীর সম্পর্ক অনেকটা ‘সাপে-নেউলে’। দলের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক মনোনয়ন ঘোষণার আগে নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগের সভায় শামীম ওসমানের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত সভায় তৃণমূলের ‘প্রার্থী’ নামে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেনকে তড়িঘড়ি করে মনোনয়নের জন্য বাছাই করে মিডিয়ায় প্রচার করা হয়। সেলিনা হায়াৎ আইভীর নাম কেউ উচ্চারণও করেনি। স্পষ্টই বোঝা গেছে যে, প্রধানমন্ত্রী বিদেশে অবস্থানকালে এমন একটি সিদ্ধান্ত ‘তৃণমূলের প্রার্থী’ বলে গ্রহণ করা হয়েছিল দলের নীতিনির্ধারকদের ওপর একটা মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করার জন্য যাতে শামীম ওসমানের অপছন্দের সেলিনা হায়াৎ আইভীকে নাসিক নির্বাচনে মেয়র পদের জন্য ভাবা না হয়। সেলিনা হায়াৎ আইভী তখন কিছুই না বলে প্রধানমন্ত্রী দেশে ফেরার জন্য অপেক্ষা করেছিলেন এবং বলেছিলেন যে, প্রধানমন্ত্রী ফেরার আগে তিনি কোনো কথা বলবেন না। ‘তৃণমূলের বাছাই’ নিয়ে হ্যাঁ-না কোনো কথা বলেননি তিনি। বোঝা গেছে, শামীম ওসমানের কৌশল টিকবে না।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সম্ভবত আইভীর আগেই কথা হয়েছিল যে, আইভীই নাসিক নির্বাচন করবেন। এটা আগে থেকেই বোঝা যাচ্ছিল। মেয়াদের একেবারে শেষদিকে এসে মেয়র আইভীকে উপমন্ত্রীর মর্যাদা দেওয়া, নাসিকের জন্য প্রায় ১৭৩ কোটি টাকার বাজেট বরাদ্দ এ কথাই জানান দিচ্ছিল যে, সরকার তার হাতকে শক্তিশালী করতে, তার জনপ্রিয়তা আরও বাড়াতেই ওই কাজগুলো করেছে। বিদেশে সফর থেকে ফিরে প্রধানমন্ত্রী সবুজ সংকেত দেওয়ার পরই আনোয়ার হোসেন নয়, সেলিনা হায়াৎ আইভীকেই আওয়ামী লীগ নাসিক মেয়র পদে মনোনয়ন দিল। শামীম ওসমান গ্রুপ তা সহজভাবে নেয়নি তাও বোঝা গেল শামীম ওসমানের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক এবং পরে শামীম-আইভী দুজনকে মিলিয়ে দেওয়ার নাটকীয় ঘটনার মাধ্যমে। শামীম ওসমান বললেন, ‘ছোট বোন তুমি নিশ্চিন্তে বাড়ি যাও, আমি তোমার নির্বাচন করে দেব।’ কিন্তু সেলিনা হায়াৎ আইভী যে নিশ্চিন্ত মনে বাড়ি ফেরেননি তা বোঝা গেল দুই দিন পর। শামীম ওসমান তার সঙ্গে আছেন কিনা প্রশ্নের জবাবে আইভী বলেছেন, ‘থাকলে ভালো, না থাকলে আরও ভালো।’ না থাকলে ‘আরও ভালো’র অর্থ কি খুব দুর্বোধ্য? বার্তাটা খুবই পরিষ্কার। প্রধানমন্ত্রীর কাছে শামীম ওসমান যত কথাই দিয়ে যান না কেন আইভী হয়তো জানছেন এবং বুঝছেন যে, আসলে আইভীর পক্ষে হয়তো কাজ করছেন না শামীম ওসমান। পক্ষে কাজ করার নামে তলে তলে হয়তো তিনি তার ক্ষতিই করছেন। পক্ষে না থাকলে পক্ষের লোক বলে ক্ষতিটা অন্তত করতে পারবেন না। অর্থাৎ শামীম ওসমান সেলিনা হায়াৎ আইভীর পক্ষে না থাকলে আইভীর লাভ বেশি বলে ভাবা হচ্ছে। আইভী চাচ্ছেন ত্বকীর বাবাসহ তার আগের নির্বাচনী টিম নিয়ে কাজ করতে। সাংঘাতিক এক অবিশ্বাসের ভিতর আটকে গেছেন শামীম ওসমান। আইভীর বক্তব্যটি শামীম ওসমানের জন্য অপমানজনকও বটে! তারপর আবার আইভী শামীম ওসমানের বাবা, নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, ভাষা সংগ্রামী ও এক সময়কার প্রভাবশালী নেতা শামসুজ্জোহা সম্পর্কে একটি বিরূপ মন্তব্য করে আবারও প্রতিপক্ষের সমালোচনার ঝড়ের মুখে পড়েছেন। পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছে, আইভী বলেছেন, ‘শামীম ওসমানের বাবার চেয়ে আমার বাবা আলী আহম্মদ চুনকার অবদান দলের জন্য কম নয়। শামীম ওসমানের বাবা দল করে টাকা-পয়সা কামাই করেছেন, আর আমার বাবা দল করে অর্থ-সম্পদ খুইয়েছেন।’ স্বাভাবিকভাবেই শামীম ওসমান এতে আরও ক্ষিপ্ত, ক্ষুব্ধ হয়েছেন, কেন্দ্রে নালিশও করেছেন। ডা. আইভী সব অস্বীকার করলেও শামীমপন্থিরা তার কথা বিশ্বাস করছে না। শামীম ওসমানকে খুঁচিয়ে দিয়ে আইভীর কী লাভ হলো! এরপরও কি সরকারি, এমনকি প্রধানমন্ত্রীর চাপেও শামীম ওসমান আইভীর জন্য সৎ ও আন্তরিকভাবে কাজ করবেন? এমতাবস্থায় দলীয় প্রার্থী দিলে আইভীর আরও ক্ষতি হবে বিবেচনা থেকে সরকারি চাপেই জাতীয় পার্টি প্রার্থী দেয়নি বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করেন।

বিএনপি নাসিক নির্বাচনে একটি চমক দেখিয়েছে। সবার ধারণা ছিল তারা যদি এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে তাহলে মেয়র পদে দলীয় প্রার্থী হবেন অ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খোন্দকার। তিনি নারায়ণগঞ্জ সিটি বিএনপির সভাপতি। দীর্ঘদিন এ পদে আছেন। গত মেয়র নির্বাচনে বিএনপি তাকে সমর্থন জানিয়েছিল। পরে আওয়ামী লীগের সমর্থিত প্রার্থী শামীম ওসমানের বিরুদ্ধে ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হওয়ায় শামীম ওসমানকে পরাস্ত করার কৌশল হিসেবে অ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খোন্দকারকে শেষ মুহূর্তে বসিয়ে দেওয়া হয়। বিএনপির ভোটাররা বার্তাটা সহজেই বুঝে নেয়, লুফে নেয়। তাদের অনেকের ভোট আইভী পেয়েছেন বলে ধারণা করা হয়, তা না হলে এক লাখ ভোটের ব্যবধানে তার মেয়র হওয়ার কথা নয়। এর আগের কয়েকটি নির্বাচনে সিটি করপোরেশন এলাকায় আওয়ামী লীগ যত ভোট পেয়েছে শামীম ওসমান ও আইভীর মিলিত ভোট তার চেয়ে প্রায় ৩৫%-৪০% বেশি। বিএনপির সব ভোটার ভোট দিলে ব্যবধান আরও বাড়ত।

তৈমূর আলম খোন্দকার এখন মুখে যা-ই বলুন, এবারও তিনি নির্বাচন করতে চেয়েছিলেন বলে শোনা গেছে। কিন্তু সেখানে সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং সেই দুর্বল সংঠনের অভ্যন্তরে তৈমূর আলম খোন্দকারের অবস্থান আরও দুর্বল হওয়ার কারণে বিএনপি ভিন্নপথে হাঁটে। বলা চলে, নারায়ণগঞ্জে সাধারণের মধ্যে বিএনপির সমর্থন বিপুল। এক সময় নারায়ণগঞ্জে সব সংসদীয় আসনই ছিল বিএনপির। সর্বশেষ যে সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করেছে তাতে নাসিক এলাকায় বিএনপি ভোট পেয়েছিল লক্ষাধিক। তাদের সে জনসমর্থন এখনো আছে বলে ধারণা করা হয়। তাই সংগঠন দুর্বল হলেও ভালো প্রার্থী দিলে এবার নাসিক নির্বাচনে ভালো ফল করতে পারবে বলে দৃঢ় বিশ্বাস থেকেই এবার তারা প্রার্থী করেছে দলের আরেক নেতা অ্যাডভোকেট শাখাওয়াত হোসেনকে। তিনি নারায়ণগঞ্জ বার অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাচিত সভাপতি ছিলেন। নারায়ণগঞ্জ সাত খুন মামলায় তিনি বাদী পক্ষের আইনজীবী হিসেবে বেশ সুনাম অর্জন করেছেন। সৎ চরিত্রবান লোক হিসেবেও তার খ্যাতি আছে। কিন্তু আওয়ামী লীগের মতো তারও সমস্যা হচ্ছে, তার দলের পরিপূর্ণ সমর্থন তিনিও পাচ্ছেন না। তবে পার্থক্য হচ্ছে, আওয়ামী লীগ কর্মী-ক্যাডারভিত্তিক দল। সেখানে দলের পূর্ণ সমর্থন ও ভূমিকা ছাড়া কোনো প্রার্থীর কোনো নির্বাচনে বিজয়ী হওয়া দুরূহ ব্যাপার। যেমন, বিগত সিটি নির্বাচনে দলের একটি অংশের বিরোধিতার কারণে শামীম ওসমানের মতো শক্তিশালী প্রার্থী অপেক্ষাকৃত দুর্বল সেলিনা হায়াৎ আইভীর কাছে লক্ষাধিক ভোটের ব্যবধানে হেরে যান— যদিও বিএনপি নির্বাচন থেকে সরে যাওয়া, এ বি এম মূসাসহ ঢাকার বুদ্ধিজীবীদের একটি অংশের সেলিনা হায়াৎ আইভীর পক্ষে দৃঢ় অবস্থানসহ নানান সমীকরণ কাজ করেছে। তবে সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগ যে নারায়ণগঞ্জে খুবই শক্তিশালী এবং শামীম ওসমান যে সেখানে ক্ষমতাসীন দলের প্রাণপুরুষ তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সেলিনা হায়াৎ আইভীকে জিততে হলে কেন্দ্রের সমর্থন, কেন্দ্রীয় নেতাদের বক্তৃতাবাজিতে তেমন লাভ হবে না; তার ব্যক্তিগত ইমেজ, তার পিতা আওয়ামী লীগের প্রয়াত নেতা আলী আহমেদ চুনকার ভাবমূর্তির সঙ্গে নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা পরিবার জোহা-ওসমান পরিবার এবং শামীম ওসমানের সাংগঠনিক ক্ষমতা ও তার অনুসারীদের সমর্থন খুবই জরুরি। তার জেতার পেছনে এবার তার সংগঠনটি হবে মূলশক্তি। এবার আগের সমীকরণ আর অটুট নেই। গতবারের মতো শামীম ওসমান-বিরোধী ওয়েভ এবার নেই তেমন। এ বি এম মূসার মতো ব্যক্তিত্ব এবার কমই পাওয়া যাবে ঢাকা থেকে সমর্থন জোগানোর জন্য। কেননা, এবার বিএনপি সেখানে নির্বাচন করছে। গতবার যারা তাকে সমর্থন করেছিলেন, নারায়ণগঞ্জ গিয়ে তার পক্ষে বক্তৃতাও করেছেন, সেই সব বুদ্ধিজীবী-সাংবাদিক যারা বেঁচে আছেন, তারা কি বিএনপি প্রার্থীর বিরুদ্ধে তাকে সমর্থন করতে যাবেন? তাই আইভীর জন্য এবার দরকার দল— ঐক্যবদ্ধ আওয়ামী লীগের সমর্থন। অ্যাডভোকেট শাখাওয়াতের জন্য কিন্তু তার প্রয়োজন নেই। কারণ সেখানে দল দুর্বল, জনসমর্থন শক্তিশালী। অ্যাডভোকেট শাখাওয়াত হোসেন যদি দলের যে ভালো অংশটি তাকে সমর্থন করছে তাদের নিয়ে জনগণের কাছে ঠিকমতো পৌঁছতে পারেন, তাহলে তার ভালো করার কথা বলে ভাবছেন পর্যবেক্ষকরা। তবে এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা কী হয়, প্রশাসন কী আচরণ করে তার ওপর নির্ভর করবে অংশগ্রহণমূলক এ নির্বাচন কতটা গ্রহণযোগ্য হবে। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের সামনে এ দুটি নির্বাচনই এখন আছে। তারা যদি ভাবেন, সব পরীক্ষাতেই তো ফেল করেছি, আর এ পরীক্ষায় পাস করলেই কী, না করলেই বা কী। টোটাল পাসের সার্টিফিকেট তো আর পাওয়া যাবে না। তাই ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচন, তিন সিটি নির্বাচন, উপজেলা নির্বাচন, পৌরসভা নির্বাচন এবং ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মতো যদি কেন্দ্র দখল, গোলযোগ সৃষ্টি করে ভোটার বিতাড়ন, ব্যালট বাক্স, ব্যালট পেপার ছিনতাই, সিল মারামারির মহোৎসব হয় তাহলে এই নাসিক নির্বাচনও বিতর্কিত হয়ে যাবে। সেলিনা হায়াৎ আইভীকে যদি রাষ্ট্রশক্তি ব্যবহার করে জিতিয়ে আনা হয়, তার বর্তমান ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন হবে। এই নির্বাচন স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হচ্ছে কিনা তা দেখে মানুষ বুঝবে সরকারের অভিপ্রায়। আগামী সংসদ নির্বাচনের একটা আগাম চেহারাই তাতে দেখা যাবে। তাতে সরকারের ভাবমূর্তি আরও নিম্নগামী হবে। একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশনের দাবি তখন আরও বেশি যৌক্তিক ভিত্তি পাবে।

আগেই বলেছি, জেলা পরিষদ নির্বাচন নিয়ে সাধারণ মানুষ এবং রাজনৈতিক দলসমূহের কোনো উৎসাহ নেই। কারণ জেলা পরিষদ নির্বাচন হবে সম্পূর্ণই একদলীয়। এরশাদ এ নির্বাচন বর্জন করেছেন। তবে এ নির্বাচনে আইয়ুব খানের বিডি নির্বাচনের মতো টাকার খেলা হতে পারে সরকারদলীয় প্রার্থীদের মধ্যে। এমনকি সহিংসতার মাত্রাও সহ্যসীমা অতিক্রম করতে পারে। সরকার এবং বর্তমান নির্বাচন কমিশন এই দুই নির্বাচনে কী ভূমিকা পালন করে তা-ই এখন দেখার বিষয়।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট

ই-মেইল : kazi.shiraz@yahoo.com