আজ-  ,
basic-bank
পরীক্ষামূলক প্রকাশনা
basic-bank
সংবাদ শিরোনাম :

শাকিলের স্ত্রী যদি আপনার বোন হতো

এ কে এম ওয়াহিদুজ্জামান

চিন্তা করুন আপনার বোনের স্বামী আরেক পুরুষের স্ত্রীর প্রেমে মত্ত হয়ে কবিতা লিখছেন, কিন্তু সেই নারী বার বার তাকে হয়রানী করা হয়েছে বলে অভিযোগ তুলছেন।

গভীর রাতে আপনার বোন বাসায় একা আছেন, অন্যদিকে আপনার বোনের স্বামী তার মালিকানাধীন সামদাদো রেস্টুরেন্টে নিজস্ব হেরেমে বন্ধুদের নিয়ে মদ্যপান করছেন আর তাদের মনোরঞ্জন করছে কোন মডেল বা অভিনেত্রী। নেশায় চুর হয়ে আপনার বোনে স্বামী সেই সামদাদোতেই রাত্রী যাপন করছেন, ফাঁকে ফাঁকে একে তাকে ফোন করে কারো বিবাহিতা স্ত্রীর সাথে ব্যর্থ প্রেমের কথা বলে কান্নায় ভেঙে পড়ছে।

আপনার বোনের স্বামী পরনারীকে নিয়ে ফেসবুকে রগরগে কবিতা লিখছে আর সেই কবিতা পড়ছে আপনার বোন এবং আপনার কিশোরী ভাগনী।

স্তাবকদের বক্তব্য- সে প্রেমিক ছিল, বন্ধুদের সে তার সামদাদো রেস্টুরেন্টে দাওয়াত করে খাওয়াতো, বেশিরভাগ সময় সে সামদাদো রেষ্টুরেন্টেই রাত্রিযাপন করতো, মাঝে মধ্যেই গভীর রাতে সে কাউকে কাউকে ফোন করে কাঁদতো, তার একটা কোমল মন ছিল, টাকার অভাবে সে লিভারের চিকিৎসা করতে পারেনি, ক্রস ফায়ারে নিয়ে যাওয়া বিরোধী দলের কয়েকজন কর্মীকে সে জীবন ফিরিয়ে দিয়েছে ইত্যাদি ইত্যাদি।

এই তথ্যগুলোকে নির্মোহভাবে বিশ্লেষন করার জন্য নিজেকে তার স্ত্রীর ভাই হিসেবে কল্পনা করুন।

সে কেমন প্রেমিক ছিল? কার প্রেমে সে কৈফু মজনুন হয়েছিল?

সে যদি আপনার বোনের প্রেমে কৈফু মজনুন হতো তাহলে কোন আপত্তি ছিল না। এমন কী সে যদি আপনার বোনের সাথে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটিয়ে আরেক নারীর প্রেমে মত্ত থাকতো, তাহলেও কোন আপত্তি থাকতো না। কিন্তু সে তো আপনার বোনকে ঘরে রেখে আপনার ভাগ্নীকে সামদাদো নিয়ে গিয়ে ছবি তুলে ফেসবুকে পোস্ট করে পরক্ষণেই অন্য নারীকে উত্তক্ত করে রগরগে প্রেমের কবিতা লিখতো। এই বিষয়টা কেবল সামাজিক ভাবেই নয়, আইনগতভাবেও অবৈধ; শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

২০১২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রান্ড হায়াত হোটেলে সে মাতাল অবস্থায় আরেক নারীর কক্ষে ঢুকে তার শ্লীলতাহানীর যে চেষ্টা করেছিল, সেই কারণে যুক্তরাষ্ট্রের মত আধুনিক দেশেও তার জেল হবার কথা ছিল। কিন্তু তাকে তখন কোন শাস্তি না দিয়ে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছিল এবং কিছুদিন পর আবারো তাকে তার পূর্বের পদে বহাল করা হয়েছিল।

এই অনৈতিক কাজের শাস্তি কী দেয়া হয়েছিল? যে নারীকে নিয়ে এত কাণ্ড, নেই নারী কিন্তু প্রথম থেকেই বার বার তার বিরুদ্ধে হয়রানীর অভিযোগ করে গেছে। আপনার বোনের স্বামীর সম্বল ঐ নারীর সাথে তোলা দু’টি ছবি। যদি খুব ভাল করে খেয়াল করেন, তাহলে দেখতে পাবেন সেই ছবিতেও ঐ নারীকে বিব্রত দেখাচ্ছে। জড়িয়ে ধরা ছবিটার দিকে তাকিয়ে দেখুন, ঐ নারী দুই হাত দিয়ে বাঁধা দেবার চেষ্টা করছে।

আচ্ছা তর্কের খাতিরে ধরে নিচ্ছি- ঐ নারীর সাথে আপনার বোনের স্বামীর সম্পর্ক হয়েছিল। কিন্তু তারপর যদি ঐ নারী সেই সম্পর্ক ছিন্ন করতে চায়, তাহলে আপনার বোনের স্বামী তো ঐ নারীর সাথে জোর-জবরদস্তি করে সম্পর্ক ধরে রাখার চেষ্টা করতে পারে না। যদি তা করার চেষ্টা করে, তাহলে আইনের দৃষ্টিতে সেটা হবে সুষ্পষ্ট যৌন হয়রানী। আপনি না আধুনিক? আপনি না নারীবাদী? আপনি না প্রগতিশীল? তাহলে যৌন হয়রানী কাকে বলে সেটা কী আপনি জানেন না? নাকি সামদাদোতে মাগনা মদের সাথে ছোট পর্দার মডেল বা অভিনেত্রীর নগ্ন দেহ প্রদর্শনী আপনার বোনের স্বামীর এই যৌন হয়রানীকে দেখতে দেয় না?

যে সামদাদোতে মুফতে খানাপিনা করে আপনি আপনার বোনের স্বামীর প্রতি এত কৃতজ্ঞ, সেই সামদাদোর মালিকানা সে কিভাবে অর্জন করেছে সেটি কখনো জানার চেষ্টা করেছেন? কখনো জানার চেষ্টা করেছেন, ৭০/৮০ হাজার টাকা বেতনের চাকরী করে আপনার বোনের স্বামী প্রতিদিন কেবল খানা-পিনার পেছনেই কিভাবে ২০/৩০ হাজার টাকা খরচ করে? কোন মুখে আপনি আবার অন্যের দুর্নীতি নিয়ে কথা বলেন?

যে লোক সামদাদোতে বসে টিভিতে সন্ধ‌্যার খবর দেখার সময় একটি টিভি চ্যানেলের সাংবাদিককে ফোন করে অশ্লীল ভাষায় শাসাতো, সেই একই লোক একই দিন গভীর রাতে ফোন করে অন্য সাংবাদিকের কাছে কান্নাকাটি করতো। এটা যে মানসিক রোগাক্রান্তের লক্ষণ সেটা কখনো মনে হয়নি? আর আপনি ভেবেছেন এটা তার কোমল মনের পরিচয়?

আপনি আবার লিখেছেন, আপনার বোনের স্বামীর নাকি লিভারে সমস্যা ছিল, চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাবার প্রয়োজন ছিল, কিন্তু টাকার অভাবে যেতে পারেন নাই। মিথ্যা বলার আগে একটু চিন্তা করে নেবেন না? যে লোক একজন সাংবাদিককে গাড়ি মেরামতের জন্য পকেট থেকে এক ঝটকায় ১লাখ টাকা বের করে দিতে পারে, প্রতি সন্ধ্যায় ২০/৩০ হাজার টাকা খাবার ও মদের পেছনে ব্যয় করতে পারে তার আবার চিকিৎসার টাকার অভাব হয় কিভাবে?

আপনার বোনের স্বামী কয়েকজনকে ক্রস ফায়ারে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়েছেন বলে আপনি তাকে মহান ভাবছেন? মোটেই না। তিনি তার ক্ষমতা দেখিয়ছেন মাত্র। প্রাচীন রোমান সম্রাটরা গ্লাডিয়েটরদের লড়াই শেষে প্রায়শ:ই পরাজিত গ্লাডিয়েটরের জীবন ভিক্ষা দিতেন। এটার মাধ্যমে তারা তাদের ক্ষমতা দেখাতেন। কারণ জীবন নেবার চেয়ে জীবন দেবার দেবার জন্য অনেক বেশি ক্ষমতাবান হতে হয়। আপনার বোনের স্বামী সেই ক্ষমতার প্রদর্শনীই করেছেন। মিডিয়ায় কোন খবর যাবে, কোনটা যাবে না; কে টক-শো করবে, কে করবে না; কাকে গুম করতে হবে, ব্লগে-ফেসবুকে লেখার কারণে কাকে জেলে পাঠাতে হবে, কাকে পদলেহী করার উদ্দেশ্যে জেল থেকে মুক্ত করা হবে বা ক্রস-ফায়ার থেকে বাঁচিয়ে দেয়া হবে, সেগুলো আপনার বোনের স্বামী নির্ধারণ করতেন। আপনার জীবন রক্ষার জন্য তাকে মহান ভাবার কোন কারণ নেই। ওটা ছিলো, আপনাকে ফাঁদে আটকানোর এবং আপনাকে তার ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য।

আপনার বোনের স্বামীর নারী লিপ্সা, মাদকাসক্তি এবং সামদাদো কেন্দ্রীক আরো সব অনৈতিকতার বিষয়টি তার নিয়োগকর্তা শেখ হাসিনাও জানতেন। কিন্তু তিনি জেনে-শুনে এসব বিষয়কে প্রশ্রয় দিয়েছেন। কেন দিয়েছেন? কারন ঐ সামদাদো ছিল একটি ব্রেইন-ওয়াস কেন্দ্র। কাউকে মদ দিয়ে, কাউকে নারী দিয়ে, কাউকে গরম দিয়ে, কাউকে জীবন ভিক্ষা দিয়ে, আবার কাউকে জেল থেকে মুক্ত করে সেখানে নিয়ে শাকিল এবং সরকারের প্রতি অনুগত করে রাখা হতো।

কাউকে কাউকে অবশ্য নিয়ন্ত্রিত সরকার বিরোধিতার অনুমতিও দেয়া হতো। যেন, দ্যাখো আমি কত উদার! সরকারের বিরুদ্ধেও দু-চার কথা বলার অনুমতি দিচ্ছি।

কাজেই শাকিলের এই রোমান সম্রাট হয়ে ওঠার পেছনে আমি শেখ হাসিনার প্রশ্রয়ের পাশাপাশি দেশের নষ্ট হয়ে যাওয়া সাংবাদিক, কবি, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী এবং পেশাজীবীদেরও দোষ দেই। আইয়ুব খানের আমলেও এভাবেই এই গোষ্টীকে দিয়ে জুতার তলা চাটানো হতো। আপনার বোনের স্বামীর বন্দনাকারীরা যদি ১৯৭১ সালে এই দেশে থাকতো এবং ইয়াহিয়া-টিক্কা-নিয়াজী যদি ক্যন্টনমেন্টে তাদের জন্য মুফতে খানা-মদ আর নারীর ব্যবস্থা করতো, তাহলে তারা সেখানেও যেত। কারণ এদের কোন নীতি নৈতিকতাবোধ নেই, আছে পদলেহনের লম্বা জিহবা।

আপনার বোনের স্বামী যে মানুষকে উপকারের ছলে বাক্সবন্দী করতো, সেটার প্রমান জার্মান প্রবাসী এক ব্লগারের অভিজ্ঞতা থেকেও জানা যাচ্ছে।

এমন অভিজ্ঞতা আমারও হতে পারতো। আমার বিরুদ্ধে আপনার বোনের স্বামী মামলা দেয়ানোর পর, প্রথম যখন হাইকোর্ট থেকে জামিন পেলাম তখন এক সাংবাদিকের মাধ্যমে আপনার বোনের স্বামী আমাকেও ডেকে পাঠিয়েছিল। আমি যাইনি। জেল থেকে বের হবার পর আরেক সাংবাদিক নিজে যেচে তার কাছে নিয়ে যাবার জন্য পীড়িপিড়ি করেছিল। আমি রাজি হইনি।

আমার দর্শন খুবই সরল। যতদিন বাঁচবো, মাথা উঁচু করে বাঁচবো। আমার জিহবা, কলম এবং কি-বোর্ডের মালিক আমি নিজে। জেলে পাঠিয়ে, চাকরিচ্যুত করে বা পদলেহীদের দিয়ে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা-নোংরা প্রচারণা চালিয়ে কোন লাভ হবে না।